Monday, July 20, 2026
PrimeBulletin

Ongoing story

মরক্কো বিজয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের ৭০ বছর সময় লেগেছিল যে কারণে

মরক্কো বিজয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের ৭০ বছর সময় লেগেছিল যে কারণে

বর্তমান মরক্কো ইসলামের ইতিহাসে মাগরেব বা উত্তর আফ্রিকা হিসেবে পরিচিত। মরক্কো ছাড়াও বর্তমান আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মৌরিতানিয়াও মাগরেব অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চল বিজয় ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ এবং কঠিনতম এক অধ্যায়। ধূ ধূ মরুভূমি, বিশাল সমভূমি আর দুর্ভেদ্য পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এই অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীকে লড়তে হয়েছে একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে গিয়ে এখানে প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো সাহাবি, তাবেয়ি ও বীর যোদ্ধা। যেখানে ইরাক, সিরিয়া কিংবা মিশর জয় করতে মুসলিমদের সময় লেগেছিল মাত্র ১০ বছর, সেখানে উত্তর আফ্রিকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে প্রায় ৭০ বছর। ২৩ হিজরি থেকে শুরু করে এই অভিযান স্থায়ী হয়েছিল ৯০ হিজরি পর্যন্ত।

বিজয় অভিযানের মহানায়কেরা

উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি মুসলিম সেনাপতির দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ। ২৩ হিজরিতে আমর ইবনুল আস (রা.) বারকা, ত্রিপোলি ও ফাজজান জয়ের মাধ্যমে এই অভিযানের সূচনা করেন। তবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক (রা.) সে সময় এই অঞ্চলে অভিযান আর দীর্ঘ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এরপর খলিফা উসমানের শাসনামলে আবদুল্লাহ বিন সাদ বিন আবি সারাহ সুবাইতলার ঐতিহাসিক যুদ্ধে রোমানদের স্থলশক্তিকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেন। খলিফা মুয়াবিয়ার আমলে মুয়াবিয়া বিন হুদাইজ আল-সাকোনি বিজোর্তে, সুসা ও জালুলা জয় করেন।

তবে এই অভিযানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন উকবা বিন নাফি আল-ফিহরি। খলিফা মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের আমলে তিনি সুশৃঙ্খল অভিযানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক কায়রোয়ান নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে আবু আল-মুহাজির দিনার তিলিমসান পর্যন্ত মধ্য মাগরেব জয় করেন। খলিফা আবদুল মালিকের আমলে জুহাইর বিন কায়েস আল-বালাউই রোমানদের সহযোগী বার্বার প্রধান কুসাইলাকে পরাজিত করেন।

এরপর হাসান বিন নোমান আল-গাসানি আওরাস পর্বতে বার্বারদের কঠিন প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেন এবং কার্থেজ জয় করে তিউনিসিয়ায় মুসলিম নৌবাহিনীর ভিত্তি স্থাপন করেন। সবশেষে মুসা বিন নুসাইর ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের আমলে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে এই দীর্ঘ অভিযানের চূড়ান্ত সমাপ্তি টানেন এবং আরব ও বার্বারদের মধ্যে অভূতপূর্ব একতা তৈরি করেন।

দীর্ঘ সময় ও কঠিন প্রতিবন্ধকতার মূল কারণ

মাগরেব বিজয়ে এত দীর্ঘ সময় এবং অবর্ণনীয় কষ্টের পেছনে বেশ কিছু ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল।

প্রথমত, উত্তর আফ্রিকার বিশাল আয়তন ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি। পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি পাহাড় ও সাগরে ঘেরা। উত্তরের রিফ পর্বতমালা এবং দক্ষিণের অ্যাটলাস পর্বতমালার কারণে মুসলিম বাহিনীর জন্য সহজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বার্বার উপজাতিদের বীরত্ব ও বারবার বিদ্রোহ। বার্বাররা ছিল অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং যুদ্ধপ্রিয়। তারা প্রথম পরাজয়ের পরও বারবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে, বার্বাররা অন্তত ১২ বার ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে বিদ্রোহ করেছিল। মুসা বিন নুসাইরের সময় আসার আগে সেখানে স্থায়ী শান্তি আসেনি। সুপ্রশিক্ষিত পারসিয়ান বা রোমানদের চেয়েও এই বার্বারদের প্রতিরোধ ছিল অনেক বেশি হিংস্র।

তৃতীয়ত, বাইজেন্টাইনদের নৌ-হামলা। সিরিয়া ও মিশর হারানোর পর বাইজেন্টাইনরা যেকোনো মূল্যে উত্তর আফ্রিকা ধরে রাখতে চেয়েছিল। সে সময় মুসলিমদের নৌবাহিনী প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় বাইজেন্টাইন নৌবহরের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের।

চতুর্থত, মুসলিম যোদ্ধাদের স্বল্পতা এবং মূল কেন্দ্র থেকে দূরত্ব। বিশাল অঞ্চলের তুলনায় মুসলিম সেনাসংখ্যা ছিল অনেক কম। তাছাড়া মদিনা, দামেস্ক বা মিশর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সময়মতো প্রয়োজনীয় সাহায্য বা অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানো ছিল অত্যন্ত দুরুহ।

পঞ্চমত, মুসলিম খেলাফতের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ। খলিফা উসমানের (রা.) শাহাদাত এবং পরবর্তীতে খলিফা মুয়াবিয়ার (রা.) ইন্তেকালের পর মুসলিম বিশ্বে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ তৈরি হয়েছিল, তার কারণে উত্তর আফ্রিকার বিজয় অভিযান দুই দফায় বেশ কয়েক বছরের জন্য পুরোপুরি থমকে গিয়েছিল।

এই বিজয়ের ঐতিহাসিক সুফল

এত বড় ত্যাগ ও রক্তক্ষয় অবশ্য বৃথা যায়নি। প্রথম হিজরি শতক শেষ হওয়ার আগেই উত্তর আফ্রিকার সিংহভাগ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। সময়ের ব্যবধানে বার্বাররা শুধু মুসলিমই হননি, বরং ইসলামের সবচেয়ে বড় রক্ষক ও প্রচারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারা আরবি ভাষাকে আপন করে নেন এবং এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে বহু বিখ্যাত, কবি ও বাগ্মী। ইসলামের এই মজবুত সাংস্কৃতিক ভিত্তির কারণেই পরবর্তী সময়ে শতাব্দীপ্রাচীন ফরাসি উপনিবেশ বা পশ্চিমা আগ্রাসনও এই অঞ্চলের মানুষের ইসলামী ও আরব পরিচয় মুছে ফেলতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের এই কঠিন আত্মত্যাগের পুরস্কার হিসেবেই পরবর্তীতে স্পেনে ইসলামের বিজয় পতাকা ওড়ে। বীর সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে এই বার্বার নেতারাই স্পেনের বুকে এক নতুন গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলেন।

More

মহিমান্বিত আশুরা: ইতিহাস, তাৎপর্য ও আত্মশুদ্ধির মহোৎসব

Ongoing story

মহিমান্বিত আশুরা: ইতিহাস, তাৎপর্য ও আত্মশুদ্ধির মহোৎসব

ইসলামি শরিয়ত ও ইতিহাসের পাতায় হিজরি মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ‘পবিত্র আশুরা’ এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সৃষ্টির সূচন...

2026-06-25 14:00

মহানবীর (সা.) হিজরতের সঙ্গে যেভাবে মিশে আছে এক প্রজন্মের আত্মত্যাগ

Ongoing story

মহানবীর (সা.) হিজরতের সঙ্গে যেভাবে মিশে আছে এক প্রজন্মের আত্মত্যাগ

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির দ্বাদশ বছরের ঘটনা। মক্কার কুরাইশদের পক্ষ থেকে তখন মুসলিমদের ওপর নেমে এসেছ...

2026-06-21 13:07

বর্ষীয়ান সাংবাদিক আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিবের শোক

Ongoing story

বর্ষীয়ান সাংবাদিক আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিবের শোক

বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও বর্ষীয়ান সাংবাদিক আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহ...

2026-06-19 23:06